ভাগ্যিস, মির্জা ফখরুল বলেননি তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

বিভুরঞ্জন সরকার : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার একটি তালিকায় নাকি তার নাম আছে। নাম থাকা না-থাকা নিয়ে কোনো বিতর্কে না গিয়ে আমি সরাসরি বলতে চাই- তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার কোনো ভূমিকা ছিলো না। তবে হ্যাঁ, তিনি ভারতে গিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চীনপন্থিদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের অভিযোগে ইসলামপুর থানায় তাকে আটক রাখা হয়েছিলো। ভারতে গেলেই যদি কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয় তাহলে মির্জা ফখরুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা! কিন্তু তিনি ভারতে গিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেননি। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। তিনি কোন সেক্টরে, কোন কমান্ডারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন সেটা কি তিনি বলতে পারবেন? এ ব্যাপারে তাকে আমি চ্যালেঞ্জ দিতে পারি।
মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন, ঠাকুরগাঁয়ে যিনি ‘চোখা মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন, মুসলিম লীগের একজন ডাকসাইটে নেতা। তবে তিনি ছিলেন পোশাকআশাকে ফিটফাট, স্মার্ট মানুষ। বাইরে ফিটফাট, ভেতরে সদর ঘাটের মতো তার অন্তর জুড়ে ছিলো পাকিস্তান। পাকিস্তান ভাঙা তিনি সমর্থন করেননি। বরং পাকিস্তান রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে পাকিস্তানিরা যখন নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে তখন চোখা মিয়াও ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেটা স্বল্প সময়ের জন্য। তারপর তিনি ফিরে আসেন এবং শান্তি কমিটির মূল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। দেশ শত্রু মুক্ত হওয়ার পর তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
রাজাকার চোখা মিয়ার ছেলে মির্জা আলমগীর পিতার চেয়েও বেশি স্মার্ট। তাই তিনি ছাত্র জীবনে ‘বিপ্লবী’ রাজনীতিতে নাম লেখান। ভাষা আন্দোলনের পর পাকিস্তানে মুসলিম লীগ পরিবারের শিক্ষিত তরুণরা বিপ্লবী রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে, আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে। ষাটের দশকে ঠাকুরগাঁয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠাকুরগাঁ কলেজে দাপুটে সংগঠন ছিলো ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)। মির্জা আলমগীর কিন্তু ঠাকুরগাঁয়ে থাকতে কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে তিনি রাশেদ খান মেননের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)- এর সঙ্গে যুক্ত হন। তারা পিকিংপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মির্জা আলমগীর পিতার পক্ষ সমর্থন না করলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোনো ভূমিকা পালন করেননি।
তবে তাকে রাজাকার বলা যাবে না। কারণ তিনি ভারতে আটক ছিলেন। তার বাবাকে সামরিক শাসক এরশাাদ মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম এক পর্যায়ে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। কিন্তু আসলে তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।
তবে মির্জা ফখরুলকে একটি ব্যাপারে ধন্যবাদ জানাতেই হবে আর সেটা হলো তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলেও এটা বলেননি যে, তার বাবাও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন! এমন দাবি করলেও কেউ কেউ হয়তো বিশ্বাস করতেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কাজেই বিএনপি কি আর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল হতে পারে? জামায়াতের মতো দলকে হজম করার হিম্মত যাদের আছে তাদের পক্ষে আর অসম্ভব কি হতে পারে? যাকে দেখতে নারি তারই না চলন বাঁকা।
মির্জা ফখরুল ব্যক্তিগতভাবে একজন ভদ্র ও সজ্জন মানুষ। কিন্তু রাজনীতির পঙ্কিল পথে নেমে তার কণ্ঠ থেকেও কখনো কখনো পঙ্ক নির্গত হচ্ছে। সব গোবরে সব সময় বুঝি পদ্মফুল হয় না।

Leave a Reply