ক্রাক প্লাটুনের অভিযান

একাত্তর আমাদের গৌরবের বছর। বাঙালির পরম প্রাপ্তির বছর। এ বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ সংগ্রামের ও আন্দোলনের পর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বদেশকে শত্রুমুক্ত করেছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েই এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এসব অঞ্চলের মক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন এক একজন অধিনায়ক। বাংলাদেশের সমস্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহস ও শক্তি নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের উপহার দিয়েছেন স্বাধীন স্বদেশ।

১৯৭১ সালে ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, আখাউড়া, ভৈরব বাজার রেললাইন এবং ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ ছিল দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে। এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তত্কালীন মেজর খালেদ মোশাররফ ও সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তত্কালীন মেজর এটিএম হায়দার। দুই নম্বর সেক্টরের অধীনেই মে-জুনে ঢাকায় গঠন করা হয় ক্রাক প্লাটুন।

মেজর খালেদ মোশাররফের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং মেজর হায়দারের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা শহরে গড়ে ওঠে এই দুঃসাহসিক গেরিলা বাহিনী। এই গেরিলা বাহিনীকে বলা হতো ‘ক্রাক প্লাটুন’। ক্রাক প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় অবস্থানরত শত্রুদের নিষ্ক্রিয় করার জন্য ন’টি মাস তত্পর ছিল । তারা বিভিন্ন আক্রমণ ও অভিযানে সাফল্য অর্জন করেছিল। এসব আক্রমণ ও অভিযানের মধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ফার্মগেটে পাক সেনাবাহিনীর চেক পোস্ট, গুলবাগ এবং উলনে পাওয়ার স্টেশন, ই.পি.আর. গেট, সেনাবাহিনীর গলফ ক্লাব এবং সায়েদাবাদ আর্মি ত্রিমোহনীতে কনভয়ের ওপর আক্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ক্রাক প্লাটুন কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল এবং এদের তিনটি গোপন ঘাঁটি ছিল। এগুলোর একটি ছিল হাটখোলা রোডে। সাংবাদিক শাহদাত চৌধুরীর বাসার চিলেকোঠায়, অন্য একটি ধানমন্ডির ২৮ নম্বর (পুরাতন) মাসুদ সাদেক চুল্লুর বাসা ও অপরটি ইস্কাটনের আব্দুস সামাদের বাসায়। ধানমন্ডির ২৮ নম্বর বাসাটিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখা হতো।

ক্রাক প্লাটুনে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিল। মাতৃভূমির জন্য এঁরা প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করেছিল। এঁদের মধ্যে অনেকেই শহীদ হয়েছেন। চারজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পেয়েছেন বীর উত্তম খেতাব। আর এঁরা হলেন শহীদ বদিউল আলম, শহীদ রুমী (জাহানারা ইমামের ছেলে), শহীদ বাকের ও শহীদ জুয়েল। আরও যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁরা হলেন আলতাফ মাহমুদ (সঙ্গীত পরিচালক), আজাদ, হাফিজ, সেকেন্দার হায়াত, মোখতার ও বাবুল।

শাহদাত চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম (বর্তমানে মন্ত্রী), মাসুদ সাদেক চুল্লু, ফতেহ আলী চৌধুরী, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ, সাদেক হোসেন খোকা, শহীদুল্লাহ খান, আজম খান, ইশতিয়াক আজিজ, উলফাত আরা, হিউবার্ড, কাশেম, জিয়া, রানা, মোরশেদ নীলু, মিনুবিল্লাহ, রুপু, মুজিবর, রশীদ সিরাজ, সেকেন্দার, নজির, কামাল খালেদ, আব্দুস সামাদ, ভাসেন ও মেলায়েত হোসেন ছিলেন ক্রাক প্লাটুনের সদস্য।

ক্রাক প্লাটুনের সদস্যরা ঢাকায় গেরিলা তত্পরতার মাধ্যমে মৃুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন এবং আক্রমণ ও অভিযানে বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন। ক্রাক প্লাটুনের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন বদিউল আলম। তিনি বেশ ক’টি অভিযানে সাহসিকতা দেখান এবং একটি অভিযানে ধরা পড়েন। বন্দি শিবিরে থাকা অবস্থায়ও তিনি একজন পাকসেনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়।

বদিউল আলম এবং ঢাকা শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি অপূর্ব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। চলচ্চিত্রটির নাম আগুনের পরশমণি। ক্রাক প্লাটুনকে নিয়ে নির্মিত ওই ছায়াছবিটি আমাদের একাত্তরকে চিরদিন স্মরণ করে দেবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আত্মগৌরবের বিষয়, প্রতিদিনের অহঙ্কারের বিষয়। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ নরদস্যুদের অকথ্য নির্যাতন ভোগ করেছিল। প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ অকাতরে প্রাণ হারিয়েছিল। 

ইত্তেফাক

Leave a Reply