এক নিষ্ঠুর স্বৈরাচারের করুণ উপাখ্যান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম দশ বছরের ইতিহাস ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং রক্তক্ষয়ের নজির বিহীন দৃষ্টান্ত। এই দূর্বিষহ যন্ত্রনা উপলব্ধি করতে কোন গবেষণা দরকার নেই। সমগ্র বাংলাদেশের দাবি এবং বৈশ্বিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করলে এর করুণ অনুভূতি আপনি এড়াতে পারবেন না। সামগ্রিক অর্থে সেই সময়টা গোটা পৃথিবী জুড়ে এটিই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর হাতে তিরিশ লক্ষ নিরিহ বাঙ্গালী মারা যাওয়ার পরেও, স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম দশকে ঠান্ডা মাথার খুনির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে প্রান হারান অগনিত সৈনিক এবং মুক্তিযোদ্ধা যা বহমান রক্ত নদীর জন্ম দেয়। একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের জাতির পিতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মূলত গৃহযুদ্ধের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের আগস্ট ও নভেম্বরের দু:খজনক ঘটনার ভেতর দিয়ে যে ধারা শুরু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক আবু তাহেরের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।বিবেকের কষাঘাতে পিছিয়ে যাওয়া এই জাতি এখনো সেই ক্ষতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

১৯৮১’র মে মাসে কতিপয় সেনা সদস্যদের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন বাংলাদেশের প্রথম স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান। ইতিহাসে এটাকে একটি বিপ্লবের রূপ দিতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় অভ্যুত্থানকারীরা। জিয়া হত্যার কয়েকদিনের মাঝেই জেনারেল এম.এ.মঞ্জুরকে হত্যা করে জিয়ার অনুগত শক্তি, আপাতদৃষ্টিতে যিনি ছিলেন বিদ্রোহীদের নেতা। এগুলোই এতবছর ধরে জেনে এসেছে দেশের জনগণ।

১৯৭০ এবং ১৯৮০ ‘র দশকের যে সময়গুলো মুছে ফেলা হয়েছে, সেগুলোর তিন-চার দশক আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি পরিষ্কার। এখন বাঙ্গালীদের জন্য চক্রান্ত এবং ষড়যন্ত্রের মত বিষয়গুলো উপলব্ধি করা খুব সহজ। ঐ সময়ের ঘটনা গুলো অণুঘটকের কাজ করেছে এমন একটি অশুভ যুগের বিনির্মাণের জন্য, যা আজও অন্ধকারাচ্ছন্ন।

তৎকালীন কালো ইতিহাসে আগমন ঘটে জনাব জায়েদুল আহসানের, যিনি একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান নিয়ে তার চুলচেরা বিশ্লেষনে দেখিয়েছেন ১৯৭৭ এর অক্টোবর পরবর্তী সময়ে কিভাবে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান একের পর এক সৈনিকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

সময়টি ছিল খুবই উদ্বেগ জনক। যদিও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিবাদমান রাজনৈতিক চক্রের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই মূলত ধারাবাহিক অবস্থায় পরিণত হয়েছিলো। যেমন জাপানি এয়ারলাইন্সের বিমান হাইজ্যাকের পিছনে লুকিয়ে ছিল সত্যটা।

ষড়যন্ত্রকারীরা এমন মুহূর্তে আঘাত হানে যখন তাদের প্রধান আব্দুল গাফ্ফার মাহমুদসহ বিমান বাহিনীর সিনিয়ার অফিসারেরা রেড ব্রিগেডের সঙ্গে আলোচনার মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বিমানটি আটক করে বাংলাদেশের রাজধানীতে ভূপাতিত করতে বাধ্য করায়। যোগ্য কর্মকর্তা যাদের মধ্যে রোজ মাহমুদ ছিল হান্টার।

প্রশ্নটা থেকেই যায়। এই মানুষগুলো যাদের পরিচয় এখনো অজানা,এরাই কি ২রা অক্টোবরেই আঘাত হানতে চেয়েছিলো যখন ২৮শে সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনী দিবসে হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়? না কি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তৎকালীন এয়ারভাইস মার্শাল মাহমুদকে জানান যে তিনি অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না!!

এ বিষয়ে আহসান একটা আভাস দেন: মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত ২৮শে সেপ্টেম্বরের কয়েকদিন আগে জিয়াকে সতর্ক করেছিল এই বলে যে, সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করার একটা চক্রান্ত চলছে। রাষ্ট্রপতি জিয়া এটা গুরুত্বের সাথেই নেন এবং এরপরেই JAL হাইজ্যাকিংয়ের বিষয়টি সামনে আসে।

লাল বিগ্রেড এর সাথে কথাবার্তা যখন শেষ পর্যায়ে ছিল তখন ঢাকা সেনানিবাসের সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনী জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে উঠে। ঠিক তার আগের দিনই বগুড়া সেনানিবাসের সংঘর্ষে একজন নিহত, তিনজন আহত এবং দুইজন নিখোঁজ হোন। তেজগাঁও এয়ারপোর্টে এগারোজন বিমান বাহিনীর অফিসারকে হত্যা করা হয়, আরো দশজনকে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনী থেকে এবং প্রায় চল্লিশ জন সেনা সদস্যকে গুরুতর আহত করা হন।

জায়েদুল আহসান যেসকল তথ্য উপস্থাপন করেছেন সেখানে দেখা যায় জিয়ার অনুসারীরা, যেমন মীর শওকত আলী, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়

পরবর্তী সময়ে ২০ দিনের মধ্যে তা জিয়ার শাসনামলের অর্থহীন নিষ্ঠুরতার অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সভ্য সমাজ ব্যবস্থার আচরণের সমস্ত নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিমান বাহিনীর শত শত ‘নির্দোষ সেনা’ হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি অবিশ্বাস্য ভয়ংকর কালো অধ্যায়ে রূপ নেয়।

যাদেরকে হেফাজতে নেয়া হয়েছিল তাদেরকে ক্যাঙ্গারু আদালত (কোর্ট) বা ট্রাইবুনাল নাম দেয়া হয়েছিল এবং খুবই দ্রুততার সাথে তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়, অবশেষে রাতের পর রাত রাজধানীর কেন্দ্রীয় কারাগারের ভয়ার্ত প্রাঙ্গনে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ফাসিতে ঝোলানো মৃতদেহগুলি গভীর কুপে নিক্ষেপ করা হয়। ১৯৭৭ সালের গোটা অক্টোবর মাস জুড়ে, আজিমপুর কবরস্থানে পরিবারের অজান্তেই মৃত মানুষগুলোকে সমাহিত করা হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্র মূলক হত্যাকান্ডের ব্যাথা স্বজনেরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন।

এই হৃদয়বিদারক অবস্থার শিকার ছিলেন আলেয়া বেগম।২রা অক্টোবরের পরে বিমানবাহিনীতে কর্মরত তার স্বামীর গুম হওয়ার সপ্তাহ খানেক পরে আকাশ-পাতাল এক করেও তার কোন খোঁজ বের করতে পারলেন না,কেউ তাকে কোন খোঁজ দিতে আগ্রহীও ছিলেন না, অনেক পরে তাকে জানানো হয় তার স্বামীকে জেলে প্রেরণ করা হয়েছে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে।

এটি ছিল অসত্য, মানুষটিকে আগেই মেরে ফেলা হয়েছিল,কিন্তু তা হয়ত আরো বিশ বছর পর প্রমান হবে। এছাড়াও আরো কিছু নিরাপরাধ মানুষ ছিলেন যারা এই ঝামেলার হাত থেকে রক্ষা পেলেও দিনশেষে বিভিন্ন মেয়াদে তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, খুনের ধরণ পুরো গল্পের মতই এগিয়ে যায়।

নির্দোষরা শাস্তি পেতে থাকলো এবং জিয়া সরকার বর্বরতার পথ বেছে নিলো। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিশ্চিত না হলো যে সকল ভিন্ন মতাদর্শের লোক নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং তাদের কুক্ষিগত ক্ষমতার জন্যে কোন হুমকি না থাকে।
কিন্তু বিধিবাম! ভীতি প্রদর্শনকারী জিয়া তিনবছরের মধ্যে ঘৃণ্য অভ্যুত্থান এর মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করেন।

জায়েদুল আহসানের কাজটি মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসের লজ্জাজনক অধ্যায়ের নথি সংগ্রহের থেকে বেশি কিছু। ২রা অক্টোবর ১৯৭৭ এ সংঘটিত সামরিক বাহিনীর শত শত সৈনিকদের উপর নৃশংসতার কলাকুশলীদের মুখোশ উন্মোচনের প্রয়াস ছিল।

এদের কয়েকজন অবসরে গেলেন সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসার হিসাবে,বিশেষত বিমান বাহিনীর অফিসাররা।বাকিরা নন কমিশনড,যারা আনন্দের সাথেই ট্রাইব্যুনালের অংশ হয়েছিলেন এবং স্ব স্ব বাহিনীতে অবসরের আগ পর্যন্ত দায়িত্বপালন করেন। গণতান্ত্রিক দায়িত্বের বৃহৎ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে,এই ভয়ঙ্কর কর্মকান্ডের গোপন উপাদানগুলো চিহ্নিত করে সুবিচার নিশ্চিত করা উচিত।

জিয়াউর রহমান ২১ টা অভ্যুত্থানে টিকে থাকতে পারলেও ২২ তম অভ্যুত্থানে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয় ১৯৮১ ‘র ৩০শে মে।

(ইংরেজি থেকে অনুবাদ)