স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক,৭ই মার্চ,২৫ শে মার্চ,আর ঘোষনা পত্র পাঠক

 

20170524105536.jpg

কিছু প্রশ্ন,
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র কয়জনে পাঠ করেছিল?
আর তাদের নাম কি?
স্বাধীনতা ঘোষনার পাঠক চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা মো: আব্দুল হান্নান (এম, এ, হান্নান)২৬ মার্চ, ১৯৭১, চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা মো: আব্দুল হান্নান (এম, এ, হান্নান) বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে রেডিওতে সর্বপ্রথম পড়ে শোনান।মাত্র দু’মিনিটের ভাষণ, সৃষ্টি হল বিপ্লব।অন্যদিকে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে একি ঘোষনা পত্রটি পাঠ করেন ‘ মেজর জিয়াউর রহমান’।তার ঘোষনাপত্রটি এমন ছিল-”’আমি মেজর জিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করছি”….
কিন্তু দেখা যায় আমরা প্রায়ই বিতর্কে পড়ি এই অযৌক্তিক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা নিয়ে।অনেকের প্রশ্ন ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিলে তা ২৬শে মার্চ উদযাপন করা হয় কেন?
বিএনপির এই দাবি প্রবল হয়ে দেখা দেয় ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর। ক্ষমতা এমন এক জিনিস যার বদৌলতে মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করা সম্ভব। আর যদি হয় অর্ধসত্য, তবে তাকে পূর্ণসত্যে পরিণত করা আরও সহজ হয়ে পড়ে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে নিজের সুবিধাসরূপ কয়েকজন পাকপ্রেমিকেদেশে আসার সুযোগ দেওয়ায় সেই কৃতজ্ঞতাবোধের প্রকাশ হিসেবে যেমন, তেমনি আওয়ামী লীগ ও তার প্রতিষ্ঠাতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন না করলে বিএনপিকে প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না– এই ভাবনা থেকেও জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেখানোটা জরুরি হয়ে পড়ে আওয়ামীবিরোধীদের পক্ষে। প্রতিটি দলেরই দরকার হয় একজন আইকনিক ব্যক্তিত্ব, বা কাল্টফিগার। জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্বকে তাই তাল বানানোর চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু তারা আন্দলন ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অনিবার্য ফলাফল অস্বীকার করে ইতিহাস গড়তে চেয়েছে।

ইতিহাসের দিকে পেছন ফিরলে দেখতে পাব ১৯৬৩ সাল থেকে শেখ মুজিব ধাপে ধাপে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলেন।৬ দফা আন্দোলন,হতে বারবার গ্রেফতার,অন্বেষণ, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যদি এই কালক্রমিক আন্দোলন না থাকত তাহলে ২৬ মার্চে যে কেউ এসে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই দেশ যে স্বাধীন হত না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি আন্দোলনের এই দীর্ঘ ইতিহাস না থাকলে স্বয়ং শেখ মুজিবও হঠাৎ করে ২৬ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও দেশ স্বাধীন হত?

স্বাধীনতার পক্ষে দেশবাসীকে তিনি ধাপে ধাপে উদ্বুদ্ধ ও প্রস্তুত করে তুলেছিলেন বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং কেউ একজন এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন বলেই দেশ স্বাধীন হয়নি। ইতিহাসের ঘটনাস্রোত ও বঙ্গবন্ধু পরস্পর এমন অবিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গিয়েছেন যে সেখানে শেখ মুজিব ছাড়া আর কারও পক্ষে সেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা সম্ভবই ছিল না। যদি তা না হত, তাহলে শেখ মুজিব ছাড়াও তো তখন অনেক নেতাই ছিলেন, তারা কি ঘোষনা দিয়েছিলেন?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, রাজনৈতিক চর্চা ও আন্দোলন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির পক্ষে তা ছিল আরও অসম্ভব। সুতরং জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করাটা স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া একটা ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।

গবেষক গোলাম মুরশিদ জানাচ্ছেন যে, “বস্তুত, ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি তিনি বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন ও কামাল হোসেনকে দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার একটি খসড়া লিখিয়ে নেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান নিজেকে ঘোষক হিসেবে দাবি করেছিল?কিংবা ক্ষমতায় থাকাকালীন?কখনো কোন মিডিয়াতে প্রচার হয়েছিল জিয়াকে ঘোষক হিসেবে?ইতিহাস নিয়ে না ভেবে মুক্তিযুদ্ধের পরের তথ্য সম্পর্কে আপনি যা জানেন তা একটু নেড়েচেড়ে দেখুন।মুক্তিযুদ্ধের পর কাকে জাতির জনক বলা হয়েছিল!আর ক্ষমতায় এনে বসানো হয়েছিল?সারাবিশ্ব এর কেউই তখন জিয়াকে চিনতো না,ক্ষমতা দখলের আগ পর্যন্ত।কিন্তু তার মৃত্যুর পর কিভাবে তার সাথে জাতির জনকের সাথে তুলনা করা হল?কারা করলো?

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের আগে এতোই রাজনৈতকি ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রবল ও পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্র তখন চালিত হচ্ছে সশস্ত্র শাসকদের দ্বারা নয়, বরং নিরস্ত্র বিরোধী দলের একজন নেতার নির্দেশে। এমন ঘটনা ইতিহাসে খুবই বিরল। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তো তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, যাকে স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না:

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

“এর পর থেকে সরকারী অফিস-আদালত, ব্যাংক, সমুদ্রবন্দরের কাজ– সবই চলতে থাকে তাঁর হুকুম মতো।

-ফাহিম তানভীর